খেলতে খেলতে পড়া... পড়তে পড়তে খেলা...
সামান্য উপকরণ ব্যবহার করে তড়িৎ বিজ্ঞানের পাঁচটি পরীক্ষামালা রেকর্ডিং করা হলো । গত ৬ সেপ্টেম্বর।
৩০টির মতো ক্লাস্টার পরীক্ষা মালার মধ্যে দিয়ে কোন এক ছাত্র বা ছাত্রী যদি যায় তাহলে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পদার্থবিজ্ঞানের সমস্ত জ্ঞান তার অর্জন করা সম্ভব ? হ্যাঁ সম্ভব ।
আমাদের সকলের , প্রথাগত ভাবনা অর্থাৎ প্রথম থিওরি পড়া, তারপর প্রাক্টিক্যাল করবে ছাত্রছাত্রীরা । এই ভাবনা থেকে বেরিয়ে গোটা পৃথিবীর সাথে তাল মিলিয়ে - আগে হাতে কলমে কাজ করবে , তারপর সেই কাজ থেকে প্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক জ্ঞান ছাত্রছাত্রী অর্জন করবে এই ভাবনা থেকে ৩০ টির মত ক্লাসটার এক্সপেরিমেন্ট ডিজাইন করেছেন পদার্থবিজ্ঞানের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অধ্যাপক ডক্টর সুভাষচন্দ্র সামন্ত মহাশয়।
ওনার এই ভাবনায় সামান্য উপকরণ ব্যবহার করে, যে অসামান্য পরীক্ষাগুলি করা যায় । যার সাহায্যে একাদশ- দ্বাদশ শ্রেণীর পদার্থবিজ্ঞানের সমস্ত তত্ত্ব ছাত্র-ছাত্রীরা শুধু বুঝবে তাই নয়, সেই সংক্রান্ত সমস্ত অংক সাবলীল ভাবে করতে পারবে। অনেক বেশি ভালোভাবে করতে পারবে।
আমরা অনেক সময় দেখি , বইপত্রে খুব দামী উপকরণ ব্যবহার করে দামী পরীক্ষা ! অধ্যাপক ডক্টর সুভাষচন্দ্র সামন্ত মহাশয় বলেন - " মূলত প্রাশ্চাত্যের ভাবনায় এই বিষয়টাই ছিল - যে প্রচুর দামী দামী উপকরণ লাগুক কোনোও ক্ষতি নেই, কিন্তু সেই পরীক্ষাগুলো থেকে ছাত্রছাত্রীরা শিখুক ।
অক্ষয় কুমার দত্ত বিদ্যাসাগর মহাশয় এর মত প্রাতঃস্মরণীয় মানুষ যখন প্রথম এদেশে বাংলায় বিজ্ঞান বই লেখার পরিকল্পনা করছেন , তখন তাঁদের কাছে , প্রাশ্চাত্যের বিজ্ঞান শিক্ষা আমাদের দেশে আনার জন্য, সেই সময় ওই ধরনের পরীক্ষাগুলিকে সরাসরি অনুবাদ করে আমাদের বই পত্রে তুলে ধরা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। কারণ নতুন করে এদেশে বিজ্ঞান শিক্ষার পদ্দতিমালা নিয়ে নিয়ে কাজ করে , তা বই আকারে প্রকাশ করার মতো সময় - সুযোগ ও অর্থ তাঁদের কাছে ছিল না।
আবার যেহেতু , নানা দেশ লুঠ করে পাশ্চাত্যের নীতি নির্ধারক মানুষদের অর্থের কোনও অভাব ছিল না তাই পরীক্ষা করার জন্য যেকোনোও ধরনের ইচ্ছেমত দামী উপকরণ তাঁরা ব্যবহার করেছেন ফলে দামি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দামি উপকরণ ব্যবহার করে বিজ্ঞানের পরীক্ষা করার যে রেওয়াজ ইউরোপের দেশগুলিতে ছিল, তাই অনুসৃত হয় আমাদের বইপত্রে।
তার এক উদাহরণ অর্ধ গোলক ব্যবহার করে বায়ুর চাপ এর পরীক্ষা। যেখানে ঘোড়া দিয়ে সেই অর্ধগোলক দুটিকে টানার কথা লেখা ছিল। কিন্তু এই পরীক্ষা ভারতের কোন একটা স্কুলে করা সম্ভব নয়, কারণ ঘোড়া কিনে এই ধরনের পরীক্ষা করা হবে এবং তার জন্য অর্থের যোগান হবে তা ভাবা একেবারেই যায়না। "
অথচ, টেবিলের উপর কাঁচের টপ বসানোর জন্য যে প্লাস্টিকের যে ভ্যাকুম কিনতে পাওয়া যায় সেই দুটোকে মুখোমুখি বসালেই বায়ুর চাপ যে কতটা শক্তিশালী , এমনকি প্রতি বর্গ একক ক্ষেত্রফলে বায়ু কতটা বল প্রয়োগ করছে , তার মানও যে মাপা যায় , তার সুন্দর পরীক্ষা ডিজাইন করেছেন মাননীয় সুভাষ চন্দ্র সামন্ত মহাষয় । এবং তা হাতের কাছের সামান্য উপকরণ দিয়েই যায় ।
প্রফেসর সামন্ত মহাশয়ের কাজের গভীরতার আরো একটি উদাহরণ। তামার মত ধাতু যার রোধাঙ্ক অত্যন্ত কম তার রোধ বের করার জন্য যে পরীক্ষামালা আমাদের বইপত্রে উল্লিখিত আছে তার জন্য প্রায় হাজার ত্রিশ চল্লিশ টাকার খরচ হয়। প্রয়োজন হয় প্রায় কেজি দশেক পারদের। তিনি আরো বলেন
" M Sc তে এই পরীক্ষা করার সময় থেকেই আমার ভাবনায় ছিল , তামার রোধাংক বের করার জন্য এতো জটিল পরীক্ষাই করতে হবে ? কেন সামান্য উপকরণ ব্যবহার করে তা করা যায় না ?
অবশেষে প্রফেসর সুভাষচন্দ্র সামন্ত মহাশয় এই পরীক্ষাটি ডিজাইন করেছেন সামান্য একটি গ্যালভেনোমিটার ব্যবহার করে এবং তার সাথে সমান্তরাল সমবায় পরীক্ষিত ধাতু রেষেষ গ্যালভানোমিটার মাইক্রো অ্যাম্পিয়ার মানের সূক্ষ্ম কারেন্ট মাপতে পারে। ফলে খুব সহজেই, গ্যালভেনোমিটার এর সাথে, সমান্তরাল সমবায় কোনও ধাতু যোগ করলে প্রবাহমাত্রা সামান্যতম পরিবর্তন মেপে ফেলতে পারে গ্যালোমিটার। এবং এর সাহায্যেই সামান্য একটি গ্যালভেনোমিটার ব্যবহার করে তামার মতো কম রোধাঙ্ক এর ধাতুর রোধাঙ্ক নির্ণয় করা যায়।
প্রফেসর সামন্ত বলেন " It took 30 years to design this experiment" ।
এমনই অসাধারণ , মনি মুক্তোর মত ভাবনা রয়েছে প্রফেসর সহ নানা ধরনের মানুষের শিক্ষা বিদদের। যারা সারাটা জীবন চেষ্টা করেছেন কি করে হাতে-কলমে কাজের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের বিজ্ঞান শেখানো যায়। যার আরো একটি উদাহরণ ডঃ অমল কুমার কুমার মহাশয় আবিষ্কৃত ।
ডবল সিলিন্ডার গ্যাস জেনারেটর।
এমনিতে, অষ্টম নবম শ্রেণীতে, হাইড্রোজেন অক্সিজেন নাইট্রোজেন অ্যামোনিয়া কার্বন ডাই অক্সাইড এর মত বিভিন্ন ধরনের গ্যাস তৈরীর কথা এবং তার বিভিন্ন ধর্ম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার কথা বইপত্রে থাকলেও, লাখে এক দুটি ছাত্রছাত্রীর ওই অষ্টম নবম শ্রেণীতে হাতে-কলমে এই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ ঘটে।
তার কারণ কেমিস্ট্রির ল্যাবরেটরি ব্যবহার করার সুযোগ একাদশ দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীদের ঘটে।
আর যদিও বা কোন কোন শিক্ষক-শিক্ষিকা তাদের নিয়ে হাতে-কলমে পরীক্ষাটা ল্যাবে গিয়ে করান তখন কিন্তু তারা সচেতন থাকেন যাতে যন্ত্রপাতি ছাত্র-ছাত্রীরা কেউ নিজেরা হাত না দেয়।
কারণ যন্ত্রপাতির এতই দাম , বিশেষ করে কিপ যন্ত্রের যে তা, খুব যত্ন করে রাখতে হয়।
অথচ, কেরী সাহেবের আবিষ্কৃত হাজার হাজার টাকা মূল্যের কিপ যন্ত্রের পরিবর্তে, সামান্য প্লাস্টিকের কন্টেনার ব্যবহার করে আমাদের বাংলার এক মহান শিক্ষক ডাবল সিলিন্ডার গ্যাস জেনারেটর আবিষ্কার করেছেন যার সাহায্যে ছাত্রছাত্রীরা, জীবন শিক্ষা পরিষদ আয়োজিত রসায়নে কত রস কর্মশালায় নিজেরাই , হাইড্রোজেন অক্সিজেন নাইট্রোজেন অ্যামোনিয়া কার্বন ডাই অক্সাইডের মত গ্যাস , নিরাপদে তৈরি করেছে তাই নয়, সেই গ্যাস ব্যবহার করে গ্যাস গুলির নানা ধরনের ধর্ম নিজেরাই যাচাই করেছে।।
ড. অমল কুমার কুমার মহাশয় এই যে যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন যা তিনি নিজেই পেটেন্ট পেয়েছেন, তার বাজার মূল্য মাত্র ১০০ টাকা। !
ভাবা যায় ? !! ঠিক তেমন ভাবে গনিত কে কীভাবে মূর্ত করে তোলা যায় তাই নিয়েও গভীর কাজ করে চলেছে জীবন শিক্ষা পরিষদ । বানিয়ে চলেছে গনিতে নানা শিখন উপকরণ । যার সাহায্যে যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ থেকে থেকে শুরু করে বীজগণিতের নানা বিষয় থেকে শুরু করে দৈর্ঘ্য ক্ষেত্রফল আয়তন ইত্যাদি নানা রাশির নানা এককের মুহূর্ত ধারণা ছাত্র-ছাত্রীরা গড়ে তুলতে পারবে। এবং নানা স্কুল ও আগ্রহী মানুষজন যাতে এগুলি সংগ্রহ করতে পারেন, তার জন্য , তা একটি কুটির শিল্প আকারে গড়ে তুলেছে জীবন শিক্ষা পরিষদ । প্রয়োজন এই সমস্ত বিষয়গুলিকেও ভিডিও আকারে তুলে ধরা ।
এমতাবস্থায় জীবন শিক্ষা পরিষদ, ডক্টর দিলীপ কুমার সোম, আই এ পি টি এ, "খোঁজ" এবং আরোও শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায়, প্রফেসর সামন্ত মহাশয় এর মতো মানুষের ভাবনায় থাকা সমস্ত পরীক্ষামূলক গুলি সুন্দর করে ঘটিয়ে তা উন্নত মানের ক্যামেরা ব্যবহার করে রেকর্ড করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
এগুলি আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য আমাদের করে যেতেই হবে।
এই কাজে আপনাদের সকলের সহযোগিতা আমরা একান্ত ভাবে কামনা করি।
এই কাজে আপনি কীভাবে সহযোগিতা করতে পারেন ?
১) আপনি যদি শিক্ষক শিক্ষিকা হন তাহলে বিষয়গুলি বুঝে নিয়ে ভিডিও রেকর্ড করার কাজে এগিয়ে আসতে পারেন ।
২) রেকর্ডিংয়ের কাজগুলি করার জন্য যে সমস্ত উপকরণ প্রয়োজন তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো উন্নত স্মার্টবোর্ড। যা আমাদের এই সমস্ত কাজকে আরো সহজ করে তুলবে এবং রেকর্ডিং এর সময় অনেকটা বাঁচিয়ে দেবে।। এছাড়াও আছে সাউন্ড সিস্টেম ক্যামেরা ইত্যাদি।
এই সমস্ত উপকরণ কিনতে ও তার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ও এডিটিং এর জন্য আর্থিক সাহায্য করতে পারেন। বা সরাসরি তা দান করতে পারে।
৩) আপনি যদি ভিডিও এডিটিং এ পারদর্শী হন তাহলে ভিডিওগুলি এডিট করতে সহযোগিতা করতে পারেন ।
৪) সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে শিক্ষক শিক্ষিকাদের মধ্যে এই শিখন পদ্ধতিমালা গুলি ছড়িয়ে দিতে সহযোগিতা করতে পারেন।
৫) সর্বোপরি আমাদের বন্ধু হয়ে আমাদের এই কাজে হাতে হাত লাগাতে পারেন !
এই লক্ষ্যে গত ৬ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক ভাবে রেকর্ডিং এর কাজ শুরু করা হয় । উপস্থিত ছিলেন ডক্টর সুভাষচন্দ্র সামন্ত এবং সান্তুনু প্রামাণিক । সহযোগিতায় প্রশান্ত লোহার ও সৌম্য সেনগুপ্ত । সামান্য উপকরন ব্যাবহার করে আমরা কীভাবে সহজেই তড়িৎ বিজ্ঞানের পরীক্ষা করতে পারি তা হাতে কলমে শিখিয়ে দিলেন বেশকিছু ছাত্র-ছাত্রী দের। যত তা সম্ভব খুব সহজে এবং খুবই কম খরচে বিজ্ঞানকে শিখানো যায় , তা আমদের শিখিয়ে দিলেন। তড়িৎ বিজ্ঞানের পরীক্ষামালার বেশকিছু অংশ (পাট ) রেকর্ডিং ও করা হয়েছে। নীচে রইল কয়েকটি নমুনা এডিট করা ভিডিও