খেলতে খেলতে পড়া... পড়তে পড়তে খেলা...
জীবন শিক্ষা পরিষদ এর উদ্যোগে এবং Indian Association of Physics Teachers (IAAPT), RC-15 ও কৃত্তিবাস মুখার্জী উচ্চ বিদ্যালয় (টাউন স্কুল), বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া-এর সহযোগিতায় গত ১৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হল “হাতেকলমে পদার্থবিজ্ঞান — চলতড়িৎ বিষয়ক একদিনের কর্মশালা”। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মধ্যে পদার্থবিজ্ঞানের ধারণাকে আরও সহজ, আনন্দদায়ক ও বাস্তবভিত্তিক করে তোলাই ছিল এই কর্মশালার প্রধান উদ্দেশ্য।
কর্মশালায় বাঁকুড়া, হাওড়া ও হুগলী জেলার মোট ৩৫ জন ছাত্রছাত্রী এবং ১৫ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা, অর্থাৎ মোট ৫০ জন অংশগ্রহণ করেন। সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দীর্ঘ এই কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা অত্যন্ত উৎসাহ ও আগ্রহের সঙ্গে বিভিন্ন পরীক্ষায় অংশ নেন। কর্মশালার বিশেষত্ব ছিল—শুধু প্রশিক্ষকের প্রদর্শন দেখা নয়, বরং প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর নিজের হাতে পরীক্ষাগুলি করার সুযোগ।
প্রশিক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডক্টর সুভাষচন্দ্র সামন্ত, ডক্টর অসিত কুমার চক্রবর্তী এবং রূপায়ন মণ্ডল সহ আরো অনেকে । তাঁদের নির্দেশনা ও সহযোগিতায় অংশগ্রহণকারীরা চলতড়িৎ-এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পরীক্ষার মাধ্যমে অনুসন্ধান করেন। প্রশিক্ষকেরা প্রতিটি পরীক্ষার তাত্ত্বিক ভিত্তি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি কীভাবে উপকরণ ব্যবহার করতে হবে, কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে এবং পরীক্ষালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে কীভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে, তা হাতে-কলমে দেখান।
কর্মশালার শুরুতে রোধের কালার কোড দেখে কার্বন রেজিস্ট্যান্সের রোধ নির্ণয় এবং মাল্টিমিটারের সাহায্যে তা যাচাই করা হয়। এরপর রোধের শ্রেণী সমবায় ও সমান্তরাল সমবায়, বিভিন্ন রোধের combination তৈরি করে তুল্য রোধ নির্ণয় এবং মাল্টিমিটারের মাধ্যমে তা যাচাই করার কাজ করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা নিজেরাই সার্কিট তৈরি করে তাত্ত্বিক হিসাবের সঙ্গে পরীক্ষালব্ধ ফলাফল তুলনা করেন।
চলতড়িৎ-এর চৌম্বকীয় প্রভাব বোঝানোর জন্য ওরস্টেডের পরীক্ষা, অ্যাম্পিয়ারের সন্তরণ সূত্র, তড়িৎচুম্বক তৈরি, ফ্যারাডের তড়িৎচৌম্বকীয় আবেশ এবং লেঞ্জের সূত্র-এর পরীক্ষাগুলিও করা হয়। তড়িৎপ্রবাহের ফলে চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি, চুম্বকের গতির ফলে গ্যালভানোমিটারের বিক্ষেপ এবং অ্যালুমিনিয়াম পাত্রের উপর চুম্বকের দোলন থেমে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলি অংশগ্রহণকারীরা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন।
এছাড়াও আলু, তামা ও ম্যাগনেসিয়াম ব্যবহার করে তড়িৎকোষ তৈরি করে তার মুক্ত বর্তনী বিভব বা EMF নির্ণয় এবং বহিঃবর্তনীতে রোধ যুক্ত করে তড়িৎকোষের অভ্যন্তরীণ রোধ নির্ণয়ের কাজ করা হয়। গ্যালভানোমিটারের এক ঘর বিক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় তড়িৎপ্রবাহ, গ্যালভানোমিটারের রোধ এবং থার্মিস্টারের বৈদ্যুতিক ধর্ম পর্যবেক্ষণের মতো পরীক্ষাও কর্মশালার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
প্রতিটি পরীক্ষার জন্য অংশগ্রহণকারীদের হাতে মূল তত্ত্ব, উপকরণ, কর্মপদ্ধতি, পর্যবেক্ষণ সারণি, হিসাব, গ্রাফ এবং “কী দেখলাম–কী শিখলাম” অংশসম্বলিত কর্মপত্র তুলে দেওয়া হয়। ফলে ছাত্রছাত্রীরা শুধু পরীক্ষার ফলাফল জানার পরিবর্তে নিজেরাই তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পায়। শিক্ষক-শিক্ষিকারাও এই পদ্ধতিতে শ্রেণিকক্ষে বিজ্ঞান শিক্ষার নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
কর্মশালার একটি বিশেষ আকর্ষণ ও উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল Indian Association of Physics Teachers (IAAPT), RC-15-এর পক্ষ থেকে প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীকে একটি করে ডিজিটাল মাল্টিমিটার উপহার দেওয়া। এই উপহার ছাত্রছাত্রীদের কাছে শুধু একটি যন্ত্র নয়, বরং ভবিষ্যতে নিজেদের উদ্যোগে বিদ্যুৎ ও পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন পরীক্ষা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণ-উপকরণ হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে হাতে-কলমে বিজ্ঞান শিক্ষাকে কর্মশালার দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাড়ি ও বিদ্যালয়ে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হল।
সমগ্র কর্মশালায় ছাত্রছাত্রীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আগ্রহ এবং প্রশিক্ষকদের আন্তরিক সহযোগিতা একটি প্রাণবন্ত শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করে। বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে আলোচনা, প্রশ্ন করা এবং নিজের হাতে তৈরি সার্কিট পরীক্ষা করার মধ্য দিয়ে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা ও যুক্তিনির্ভর চিন্তার বিকাশ ঘটে।
জীবন শিক্ষা পরিষদের “শেখা হোক আনন্দের, অর্থবহ ও জীবনকেন্দ্রিক” ভাবনাকে সামনে রেখে এই কর্মশালা ছিল বাস্তবভিত্তিক বিজ্ঞান শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। বইয়ের সূত্রকে বাস্তব পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত করে “নিজে করো, নিজে দেখো, তথ্য সংগ্রহ করো, বিশ্লেষণ করো এবং নিজেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাও”—এই শিক্ষাদর্শনই কর্মশালার মূল সুর হয়ে উঠেছিল।
Photo Galary